শ্রী শ্রী হরি লীলামৃত (আদি খন্ড পর্ব ০৭) শ্রী শ্রী হরিলীলামৃত। আদি কান্ড গ্রন্থারম্ভ।
শ্রী শ্রী হরিলীলামৃত।
আদি কান্ড।
গ্রন্থারম্ভ।
প্রথম তরঙ্গ।
বন্দনা
জয় জয় হরিচাঁদ জয় কৃষ্ণ দাস।
জয় শ্রী বৈষ্ণবদাস জয় গৌরিদাস ॥
জয় শ্রী স্বরূপদাস পঞ্চ সহোদর।
পতিত পাবন হেতু হৈলা অবতার॥
জয় জয় গুরুচাঁদ জয় হীরমন।
জয় শ্রী গোলোকচন্দ্র জয় শ্রী লোচন॥
জয় জয় দশরথ জয় মৃত্যুঞ্জয়।
জয় জয় মহানন্দ প্রেমানন্দ ময়॥
জয় নাটু জয় ব্রজ জয় বিশ^নাথ।
নিজদাস করি মোরে কর আত্মসাৎ॥
শ্রীশ্রী হরিলীলামৃতের বন্ধনার আদ্ধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
১+২ জয় শ্রীকৃষ্ণ দাসঃ - দাস অর্থে, সেবক বা ক্রীতদাসকে বুঝায়। অর্থাৎ কোন মনিবের সেবায় সর্বদা নিযুক্ত থাকা। তাই এই স্থলে এই ক্ষীরোদ বিহারী হরি হতে পূর্বে যত যত অবতার হয়েছেন, তাঁরা সকলেই এই শ্রীহরিকে প্রভূ বলে সেবা পূজাদি করে থাকেন। শ্রী শ্রী হরিলীলামৃত গ্রন্থে দ্বাপরলীলার শ্রীকৃষ্ণ হতে ক্ষীরোদ বিহারী হরিকে বড় দেখান হয়েছে। লীলামৃত আদি খন্ড ৩৯পৃঃ
যাও অনন্ত গোচরে, জিহ্বা সে দিবে তোমারে, তাহাতে না কর অস্ত্র ঘাৎ।। এই সেই শ্রীহরি। আর তাঁর এক শক্তি কৃষ্ণদাস নামে প্রভূ হরিচাঁদের ভ্রাতা হয়ে জন্মেছিলেন। এখানে কৃষ্ণদাস শব্দটি একটু ঘুরিয়ে অর্থ করলে, যিনি কৃষ্ণের সেবক বা দাস তিনিই কৃষ্ণদাস। অর্থাৎ আপনি নিজেই কৃষ্ণের সেবক বা দাস। দ্বাপর লীলায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অগ্রজ ছিলেন বলরাম। তাকে সঙ্কর্ষণ অবতার বলা হয়। এই বলরাম দাদা সর্বদা শ্রীকৃষ্ণের ঢাল হয়ে সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন। সেই বলরাম শক্তিই এই লীলায় শ্রীকৃষ্ণদাস নামে প্রভূ হরিচাঁদের অগ্রজ হয়ে লীলা করেছেন।
৩। জয় শ্রী বৈষ্ণব দাসঃ বৈষ্ণব অর্থে যিনি প্রেম ও ভক্তির সাথে শ্রীবিষ্ণু বা ক্ষীরোদ বিহারী হরিকে ভজনা করেন তিনিই বৈষ্ণব। প্রকৃত পক্ষে আমাদের হরি ভজনের কথা জানতে হবে শিখতে হবে। শ্রী হরির লীলায় প্রকৃত ভাব প্রকাশের জন্য, স্বয়ং শ্রীহরি তাঁরই অংশ কলা বৈষ্ণব দাস নামে জন্ম নিয়ে সেই বাল্যকাল হতে ভক্তি ধর্ম্ম দেখায়ে বা শিখায়ে ছিলেন। যা তাঁর জীবন চরিতে ফুটে উঠেছে।
৪। জয় শ্রী গৌরিদানঃ- এখানে আধ্যাত্মভাবের প্রকাশে, ভগবান নিমাই চন্দ্র বা গৌর চন্দ্র তাঁর লীলায় যেমন আচ-ালকে প্রেমদান করেছিলেন। জগতের জীব সবই এক জাতি। সকলেই ছিল তাঁর কাছে আপন হতে আপন। এই লীলায় ও ঠিক প্রভূর আর এক শক্তি গৌরিদাস নামে জগতের বুকে ভ্রাতৃত্ববোধ ও প্রেম ভাব দেখায়ে ছিলেন।
শাস্ত্রে বলে শ্যাম অঙ্গ রাধা অঙ্গ মিলে হয়েছে গৌরাঙ্গ। অর্থাৎ আধ্যাত্ম জগতের বিচারে, জীবের কাম কামনা রূপ শ্যামল রংয়ের উপরে, হরি প্রেম রূপ উজ্জল আবরণ মিশিয়ে মহাপ্রেমে মত্ত থাকতে হবে। এছাড়া “গৌরি’ এই শব্দটির অর্থ কোন ব্যাকরনবিদ প্রকাশ করেননি। যদিও লীলামৃত লেখক এই শব্দটি পুরুষ বাচক শব্দে ব্যবহার করেছেন। তাই এই স্থানে বলতে হয়, গৌর শব্দের সঙ্গে ‘ই’ প্রত্যয় যোগ করে গৌরি শব্দ হয়েছে। ‘ই’ প্রত্যয়টি এখানে নিশ্চিত ভাবের প্রকাশ করতেছে। যেমন যাবই যাব। করবই করব। অর্থাৎ ভক্তি মার্গের মধ্যে বুঝতে হবে, ঈশ্বরকে পেতে হলে মন্ত্রের সাধন কিম্বা শরীর পাতন।
৫। জয় শ্রী স্বরূপ দাসঃ- ভক্ত যখন কোন কার্য সাধন হেতু কঠিণ এক ব্রত করে শ্রীহরি রূপ উৃজ্জল প্রেম সাগরে সাঁতার খেলতে থাকে, তখনই সেই ভক্তের ভাগ্যে শ্রী হরির স্বরূপ মুর্তির দর্শন ঘটে।
৬। জয় জয় গুরুচাঁদঃ- শ্রীহরিকে জানতে হলে, তাঁকে পেতে হলে, বা তাঁর প্রেম রাজ্যের সন্ধান জানতে হলে, ভক্তকে উপযুক্ত গুরুর পদে স্মরনাপন্ন্ হতে হয়। আমরা জানি সৃষ্টির আদিতে ভগবান শিব এই ব্রহ্মাণ্ডেরসযক্ষ, রক্ষ, দানব, মনুষ্যাদির গুরু রূপে পূজ্য রয়েছেন। সেই শিব অংশে জন্ম ভগবান গুরুচাঁদ ঠাকুর ও তেমনি মতুয়া ধর্মের ভক্তদিগের কাছে পরমারাধ্য গুরুচাঁদ নামে পূজনীয় রয়েছেন। শুধু এইটুকু বললে গুরুচাঁদ ঠাকুরকে অনেক ছোট করা হয়। কারণ তিনিই নিন্ম বর্ণের লোকেদের মাঝে শিক্ষার আলো জে¦লে দিয়ে গেছেন। তাঁর অবদানের কথা স্বয়ং মাতা সরস্বতী দেবী হয়তবা লিখে শেষ করতে পারবেন না।
৭। জয় হীরামনঃ- ভক্ত যখন উপযুক্ত গুরুর নিকট হতে দীক্ষা প্রাপ্ত হয়ে সেই পরমাত্মা পরব্রহ্ম ক্ষীরোদবিহারীকে ধরার রন কৌশল জেনে নেন। তখন ভক্তের মন দেবতা হীরা মানিক্যের জ্যেতিতে প্রকাশ পায়। তখন সেই জ্যোতির ঘরে শ্রীহরি রূপ জ্যেতির দর্শন মেলে।
৮। জয় শ্রী গোলক চন্দ্রঃ- জ্যেতির ঘরে জ্যেতির দর্শন । অর্থাৎ ভক্ত ভেদে ভক্তের কল্পনা রাজ্যে এই ক্ষীরোদ বিহারী হরি, যেমন পৃথিবী মধ্যে সর্ব উচ্চ ক্ষীরোদ সাগরে রয়েছেন। তেমনি ভাবে কল্পনার জগতে সর্ব উচ্চ এবং অতি মনোরম এক পুরীকে গোলক ধাম বলা হয়। এই পুরী মধ্যে শ্রীহরি বাস করেন তাই তাঁকে গোলোক বিহারী বা গোলকের চাঁদ বলা হয়। আধ্যাত্ম জগতে জীবের দেহ পুরের সর্ব উচ্চ স্থান ব্রহ্মরন্ধ্রকে গোলক ধাম বলা হয়। কিন্তু
শ্রীহরির এই লীলায় গোলক পাগল তাঁর অতি পবিত্র হৃদয়কে গোলোক ধামের সাথে তুলনা করেছেন। পূর্ণব্রহ্ম শ্রীহরি সদা সর্বদা এই পাগলের হৃদয়ে অবস্থান করতেন। যা তিনি বক্ষ চিরে দেখাতে চেয়ে ছিলেন।
৯। জয় শ্রীলোচনঃ- লোচন, চক্ষু ইন্দ্রিয়। ভক্ত বর যদি সেই ক্ষীরোদ বিহারী হরি কিম্বা গোলক বিহারী হরিকে দর্শন করতে চাহেন। তা হলে, সেই ভক্তের দিব্য চক্ষুর প্রয়োজন হয়।
১০। জয় জয় দশরথঃ- ভক্ত বা জীবাত্মা তার এই পঞ্চ ভৌতিক দেহকে রথ বানায়ে, দশ ইন্দিয়গনকে সেই রথের অশ্বরূপে যোযনা করে, (রথে জুড়ে) পরমাত্মা স্বরূপ শ্রীহরিকে দেখতে চলেছেন।
১১। জয় মৃত্যুঞ্জয়ঃ- প্রেমিক ভক্তের সঙ্গে যখন পরমাত্মা কিম্বা শ্রীহরির দেখা মেলে, তখন সেই ভক্ত মৃত্যুঞ্জয়ী হয়েন। অর্থাৎ মৃত্যুকে জয় করতে পারেন । মরিয়া ও অমর হয়েন। ১২।১৩।১৪ । জয় নাটু, জয় ব্রজ, জয় বিশ^নাথ এই সমস্ত প্রেমিক ভক্তেরা সৃষ্টির আদি হতে প্রভূর পার্ষদ রূপে লীলার সাথী ছিলেন এবং অদ্যাবধি আছেন।
১৫। দাসকরি তারকের কর আত্মসাৎঃ-
আত্মসাৎ- আত্ম সমার্পন করা বা নিজেচে সমার্পন করা। কবি চুড়া মনির রচিত বন্ধনাটি শ্রীশ্রী চৈতন্য চরিতামৃতের বন্দনার অনুকরনে করা হয়েছে। চৈতন্য চরিতামৃতে গ্রন্থকার যেমন নিজেকে ছয় গোসাই পঞ্চ রসিকের পদে আত্মনিবেদন করেছেন। লীলা মৃত লেখক ও তেমনিভাবে প্রভূ হরিচাঁদ এবং তাাঁর লীলার সাথী স্বীয় গুরু ও গুরু স্থানীয় ভক্তদের পদে আত্ম নিবেদন করে এই বন্দনাটি রচনা করেছেন।
আমরা মহাভারত, শ্রীমদ্ভাগবতাদিগ্রন্থ পাঠের পূর্বে শ্রী ভগবান নারায়ন, মাতা সরস্বতী দেবী ও শ্রীল ব্যাস দেবের চরন বন্দনা ও জয় শব্দ উচ্চারন করিয়া পাঠ শুরু করিয়া থাকি। এই জয় শব্দ ধ্বনি রমনী কুলেরাহুলুধ্বনি রূপে ব্যক্ত করিলে যেমন স্বর্গ, মর্ত, পাতাল এই তিন ভূবনের দেবতাদি সকল জীবের বন্দনা করা হইয়া যায়। তেমনি এই জয় শব্দ ধ্বনি উচ্চারন করিলে শ্রী হরিয়াদি দেবতা মন্ডলী ও তাহাদের লীলা গিতীতে পূর্ণ সমুদয় গ্রন্থয়াদির বন্দনা করা হইয়া যায়। আমাদের এই লীলামৃত গ্রন্থখানি শ্রীমৎতারক গোস্বামী মহাভারত পুরাণ ভাগবতয়াদি গ্রন্থের অন্যতম গ্রন্থবলিয়া স্বীকৃতি দিয়া গিয়াছেন। তাই তিনি সেই অনাদির আদি পূর্ণ ব্রহ্মের প্রতিমুর্তি শ্রী শ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের বন্দনা গিতীর প্রথমেই জয় শব্দ উচ্চারন করিয়া লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। বন্দনা শব্দের অর্থ হইতেছে- কোন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে ব্রতী হইয়া তাঁহার শ্রী মুর্তিকে বিগ্রহ রূপে সম্মুখে স্থাপন করিয়া, কিম্বা হৃদয় মন্দিরে স্থাপন করিয়া তাঁহাকে, শব্দ, বাক্য, ছন্দ, কাব্য গিতী বা গানের মধ্যে দিয়া স্তব স্তÍতি করা কে বন্দনা বলা হইয়া থাকে।
আবার তারই সাথে তাঁহার দ্বাপর লীলার সাথী ভ্রাতা বলদেব। যিনি এই শ্রী হরির লীলায় জ্যেষ্ঠভ্রাতা কৃষ্ণ দাস রূপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। আবার শ্রী বৈষ্ণব দাস, শ্রী গৌরিদাস ও সর্ব কনিষ্ঠ শ্রী স্বরূপ দাস ঠাকুরের নামের পূর্বে ও জয় শব্দ উচ্চারন করিয়া বন্দনা করিয়াছেন। ইহার পরে ও তিনি শিব অংশে অবতীর্ন ভগবান গুরুচাঁদ ঠাঁকুর, যিনি শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র নামে পরিচিত ও পিতা পুত্রের লীলার সহায়ক একান্ত অনুরাগী ভক্ত মন্ডলী, রাম অবতারে হনুমান অংশে জন্ম ভক্ত হীরামন, একাদশ রূদ্রের একরূদ্র অংশে জন্ম গোলোক পাগল, ভৃগুমনি অংশেলোচন গোস্বামী। ভক্ত প্রহলাদ অংশে জন্ম দশরথ গোস্বামী। আবার যিনি এই লীলায় মৃত্যুঞ্জয় গোস্বামী নামে পরিচিত । তিনি দেব গুরু বৃহষ্পতি অংশে জন্ম গ্রহন করিয়া এই লীলামৃত লেখক গোস্বামাী তারক চাঁদের গুরু হইয়াছিলেন। যিনি মহানন্দ চাঁদ নামে পরিচিত । ইনি গৌর লীলায় ভগবান নিত্যানন্দ মহা প্রভূর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বিশ্বরূপ ছিলেন। ইনি এই লীলায় প্রেমিক কবি অশি^নী গোসাইরের গুরুদেব ছিলেন।
আবার এই বন্দনা গিতীর মধ্যে ভক্তবর ব্রজনাটু, ভক্তবর বিশ^নাথ ইহারা সকলেই শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের পূর্বলীলায় অর্থাৎ,- গৌর লীলায় একান্ত অনুরাগী ভক্তছিলেন। তাই এই লীলায় ও শ্রী হরির পার্ষদ রূপে দিকে দিকে জন্মগ্রহণ করিয়া এই লীলাকে বিকশিত করিয়া গিয়াছেন। গোস্বামী তারকচাাঁদ তাই এই সমস্ত মহা সাধক দিগের নামের পূর্বে জয় জয় শব্দ দ্বারা বন্দনা করিয়াছেন। এই বন্দনাটির বিশেষত্ব বিচার করিলে এই রূপ বুঝাইতেছে যে, শ্রী শ্রী হরি ঠাঁকুরকে বন্দনা করিলে যেমন ব্রহ্মাদেবাদি সকল দেবতা মন্ডলীর চরন বন্দনা করা হইয়া যায় । আবার দেবগুরু বৃহষ্পতি অংশে জন্ম মহাত্মা মৃত্যুঞ্জয় গোস্বামীকে বন্দনা করিলে তেমনি মতুয়া ভক্ত মন্ডলীর সকল গুরু গোসাইয়ের চরন বন্দনা করাহইয়া যায়। কারণ গোস্বামী মৃত্যুঞ্জয় হইতেছেন এই মতুয়া ধর্ম প্রচারের সর্ব প্রকারের সর্ব প্রথম গুরু । তাই মহাভারতের বন্দনায় হরি শব্দ দ্বারা যেমন শ্রী হরির বন্দনা গিতী করা হইয়াছে। তেমনি এই লীলামৃত গ্রন্থের সুচনা লগ্নেই জয় জয় ধ্বনি দ্বারা শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ও তাঁহার লীলার সহকারী পারিষদ ভক্ত মন্ডলীর বন্দনা বা প্রশংশা গিতীগাহিয়াছেন। এই বন্দনাটিতে চারি যুগের ভক্ত মন্ডলীর নাম বিদ্যমান রহিয়াছে।
অথ মঙ্গলা চরন।
এই মঙ্গলা চরণটি শ্রীমৎ তারক গোস্বামী এমনভাবে রচনা করিয়াছেন। যাহার মধ্যে বিগত চাক্ষুষ মন্নন্তর ও বর্তমান স্বায়¤ু¢ব মন্নন্তরের প্রথম হইতে শেষ অর্থাৎ,- এই শেষ কলিতে যে অবতারের আগমন ঘটিবে, সেই অবতার পুরুষের নামও উল্লেখ করিয়াছেন। যাহা ভক্তিভাবে পাঠ করিলে জীবের সর্বদা মঙ্গল হইয়া থাকে।
মঙ্গলা চরন অর্থে- সনাতন ধর্মের মত পথের মনুষের নিকটে যাহা মঙ্গল সুচক কার্যাদির অনুষ্ঠান করা হয়। অর্থাৎ,- যাহা হইতে সকল মানুষের অভীষ্ট সফল হইয়া থাকে।
আমরা সাধু গুরু বৈষ্ণবদিগের মুখে শ্রবন করিয়া থাকি, কোন শুভ কর্মাদিতে যাত্রা করিবার সময়, স্ববৎসা গাভী অর্থাৎ,- দুগ্ধবতী গাভী। জলপূর্ণ কলসী, পিতা মাতা গুরুজনাদির আর্শীবাদ লইয়া জীবন যাত্রার পথে অগ্রসর হইয়া থাকি। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে এই সমস্ত ক্রিয়া করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়না। তাই সেই পরব্রহ্ম পরমেশ^রের যুগ ধর্ম মতে অবতার পুরুষেরনাম স্মরণ করিলে, মানুষের সকল Ñ আশা আকাঙ্কা পূর্ণ হয়। স্ব স্ব ইষ্ট দেবতার বন্দনা গিতী গাইয়া সমস্ত অশুভ শক্তি হইতে মুক্তি লাভ করা যায়। যাহা পাঠ করিলে সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাস হয় তাহাকে মঙ্গলাচরন বলা হইয়া থাকে। আর একটু স্পষ্ট রূপে বুঝাইতে হইলে এই রূপ বলিতে হইতেছে যে, কোন শুভ কর্ম্মাদিতে ব্রতী হইয়া বা কোন শুভ কর্ম্মাদি আরাম্ভ হইবার পূর্বে বা সেই সময়ের কালে বেদ বিধি অনুসারে স্ব স্ব ইষ্ট দেবতার উদ্দেশ্যে স্তবস্তÍতি পাঠ করাকে মঙ্গলা চরন বলা হইয়া থাকে। যাহাতে শুভ কর্মাদি বা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের যাত্রা পথ বা তাহাদের জীবন যাত্রা অতি সহজে বা নির্বিঘেœ সম্পন্ন হইতে পারে। সর্বশেষ কথা হইতেছে। নিজের অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য সাধু গুরু বৈষ্ণবয়াদি মহাত্মা দিগের নাম স্বরণ ও সর্বপোরি স্বয়ং শ্রী হরির চরণ স্মরণ করিলে সকল বাধা বিপত্তি দুর হইয়া নিজের অভীষ্ট সিদ্ধি হইয়া যায়।
‘‘হরিচাঁদ চরিত্র সুধা প্রেমের ভান্ডার । আদি অন্ত নাই যার কলিতে প্রচার।’’ এই হরিনামের আদি মধ্য অন্ত নাই। সাধু গুরু বৈষ্ণবেরা কীর্ত্তন করিয়া থাকেন, জীবের সকল শোক, দু:খ তাপ এই হরিনাম জপনা করিলে দুরভীত হইয়া যায়। এই হরি নামকে অমৃতের সহিত তুলনা করা হইয়াছে। সমুদ্র মন্থনের সময় দেবতা ও দানব দিগের মিলিত শক্তিতে যে সুধা উদ্ধৃত হইয়াছিল। সেই সুধা পান করিয়া দেবতারা অমরত্ব লাভ করিয়াছিলেন। আর মনুষ্য সকল তেমনি এই হরিনাম সুধা পান করিয়া অমরত্ত্ব বা চির মুত্তি লাভ করিতে পারেন । এই নাম ভগবান ব্রহ্মাদেব চতুর্মুখে শিব দেবতা পঞ্চমুখে। আর স্বয়ং বিষ্ণুদেব তাঁহার নিজের নামের মাহাত্ম্য নিজেই বলিতে পারেন না। কিন্তু এই নাম ধর্ম্ম বিগত যুগ গুলিতে বিতরিত হয় নাই।
সত্য, ত্রেতা, দ্বাপরের শেষ হয় কলি।
ধন্য কলিযুগ কহে বৈষ্ণব সকলি।
আমারা ভাগবত, পুরুনাদি ও শ্রী শ্রী চৈনত্য চরিতামৃত গ্রন্থের মধ্যে দেখিলে দেখিতে পাইব যে, সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি এই চারিটি যুগ, একটির পর আর একটি যুগের আগমন ঘটিয়া চক্রাকারে ঘুরিতে থাকে। গ্রন্থকার গন লিখিয়াছেন, ভগবান ব্রহ্মা দেবের একদিনে চৌদ্দটি মন্নন্ততের আগমন ঘটে। আর এই চৌদ্দটি মন্নন্তরের প্রতিটি মন্নন্তরে এই সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি যুগ ৭২ বার করিয়া চক্রকারে ঘুরিতে থাকে। এই যে এতটি যুগ অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে, কোন দিনের জন্য স্বয়ংয়ের আর্বিভাব ঘটে নাই। কেবল মাত্র যে দ্বাপরে তিনি ব্রজে অবতীর্ণ হইয়া রাসলীলা প্রকাশ করেন। ঠিকতার পরবর্তী কলিতে তিনি শ্রী রাধার ভাবকান্তি অঙ্গিকার করিয়া গৌর সুন্দর রূপে অবতীর্ণ হইয়া এই দুর্লভ কৃষ্ণ প্রেম বা ভক্তি ধন বিতরণ করিয়া থাকেন ।( চৈ: চৈ: ২য় পৃ:) তাই সাধু গুরু বৈষ্ণবেরা কীর্ত্তন করিয়া থাকেন, অষ্ট বিংশ চতুর্যুগের (অর্থাৎ ২৮দ্ধ৪ =১১২) এই শেষ কলিতে স্বয়ং ভগবান নিসাই চন্দ্র রূপে জন্ম গ্রহন করিয়া কলির সল্পায়ু জীবের দ্বারে দ্বারে প্রেম ভক্তি ধন বিতরন করিয়া কলির পাপহত জীবের মুক্তির পথ দেখাইয়া গিয়াছেন। এই কারনে কলি যুগকে ধন্য বলা হইয়া থাকে। এই কলিযুগ বিভিন্ন দোষে দোষী হইলেও সাধু গুরু বৈষ্ণবেরা এই কলি কালকে ধন্য হইতে ধন্য কলিকাল বলিয়া কীর্ত্তন করিয়া গিয়াছেন।
একদা শ্রীল ব্যাসদেব ভাগিরথী নদীতে ¯স্নান আহ্নিক করিবার সময় তাহার তীর দেশে অবস্থান রত কয়েকজন মুনি ঋষিরা বলিতে ছিলেন, কোন কালে কোন যুগে অতি অল্প সময়ে মানুষ সামান্য ধর্ম কর্মাদি করিয়া মহাফল লাভ করিতে পারে। এই রূপভাবে তর্ক বিতর্কের সৃষ্টি হইলে তাহারা নদী বক্ষে অবস্থান রত শ্রীল ব্যাসদেবের নিকটে উপস্থিত হইলে, ক্ষনপরে মহাত্মা তাঁহার আহ্নিক ক্রিয়াদি সমার্পন করিয়া তীরে দেশে উপস্থিত হইয়া ধন্য করিযুগ ধন্য বলিয়া উঠিলেন। অত:পর উপস্থিত মুনি ঋষিরা এই কথার প্রকৃত অর্থ কি,তাহাই জ্ঞাত হইবার জন্য মহাত্মা ব্যাস দেবের নিকটে প্রার্থনা করিলেন। উত্তরে শ্রীল ব্যাসদেব বলিতেছিলেন, পুরা কালে অর্থাৎ,- বিগত যুগ গুলিতে নারী জাতি ও সমাজের বুকে দলিত পতিত মানুষের বেদ ধর্ম্ম পঠন পাঠন করিবার কোন অধিকার ছিল না। বর্তমান এই কলিযুগে জাতি ধর্ম্ম বর্ণ নির্বিশেষে দেবদেবীর পূজা পার্বণাদি ও বেদ গ্রন্থাদি পঠন পাঠনে স্বীকৃতি লাভ করিয়াছে। আবার বৈদিক গ্রন্থের সারগর্ভ যাহা ভক্তি ও প্রেমে পূর্ণ হইয়া শ্রীমদ্ভাগবত ধর্ম্ম নামে পরিচিত হইয়াছে। এই হরিনাম সম্বলিত ভাগবত ধর্ম্ম সকল মানুষের জন্য সমভাবে গ্রহণ যোগ্য বলিয়া কলিযুগকে ধন্য বলা হইয়াছে।
আবার এই কলিযুগ ধন্য সম্বন্ধে শ্রী শ্রী বিষ্ণু পুরানে ৭২৪ পৃ: ৭২৫ পৃ: বলিতেছেন। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর কলি এই চারিটি যুগের মধ্যে কলিভিন্ন অন্য যুগ গুলিতে বহু বহু বছর ধরিয়া সাধ্য সাধন করিয়া সাধন লব্ধ ফল প্রাপ্ত হইত। অর্থাৎ,- সত্যযুগে দশ বৎসর ধর্ম আচরণ করিলে, ত্রেতাযুগে এক বৎসর কাল, দ্বাপর যুগে একমাস কাল অবধি সাধ্য সাধন করিলে যে ফল লাভ হইত। এই কলিযুগে বিশুদ্ধ মনের দ্বারা অহোরাত্র (এক দিবা একরাত্রি) ব্যাপী হরিনাম রূপ ধর্ম্ম কর্মাদি করিলে সত্য, ত্রেতা দ্বাপরাদি যুগের ন্যায় ফল প্রাপ্তি হইয়া থাকে। এই কারনে এই কলিযুগকে ধন্য বলা হইয়াছে। আবার চৈতন্য চরিতামৃতের ২১৬ পৃ: বলিতেছেন। এই কলিকালে স্বয়ং ভগবান এই ধরার বুকে অবতীর্ণ হইয়াছেন। সেই পরব্রহ্ম হরি, শ্রী কৃষ্ণ চৈতন্য বা ভগবান নিমাই চন্দ্র রূপে নদীয়ার বুকে জন্ম গ্রহন করিয়া জীবের দ্বারে দ্বারে হরিনাম বিতরণ করিয়াছেন। অন্যান্য যুগ গুলিতে এই হরিনাম, সেই নিত্যধামে শ্রী রাধার খাস ভান্ডারে গোপনছিল। এই পাপ হত কলির জীবের মুক্তির জন্য স্বয়ং শ্রী হরি, নদীয়ার বুকে জন্ম গ্রহন করিয়া বৃন্দাবন লীলায় তাঁহার দাস খত ঋণ শোধিবার জন্য জীবের দ্বারে দ্বারে এই হরিনাম বিতরণ করিয়া মাত্র আট চল্লিশ বৎসর কালে লীলা সাঙ্গ করিয়া আবার ও নিত্য ধামে গমন করিয়াছিলেন।
আবার ভগবত পূরাণাদিতে দেখিতে পাই স্বয়ংয়ের আর্বিভাব অন্যান্য যুগ গুলিতে হয় নাই। কিন্তু এই কলিযুগে অতি অল্প সময়ের মধ্যে স্বয়ং শ্রী হরি তিন তিনবার আর্বিভাব হইয়াছেন। প্রথমে নবদ্বীপ ধামে ভগবান নিমাই চন্দ্র নামে দ্বিতীয় ক্ষেতরে রাজশাহী জেলার মধ্যে একটি লীলা করিয়া ছিলেন। তাহার পরে শ্রীধাম ওড়াকান্দিতে স্বয়ং পূর্ণ ব্রহ্ম শ্রী শ্রী হরিচাঁদ নামে আর্বিভূত হইয়া ছিলেন। আর তারই সঙ্গে স্বয়ং শিব অংশে জন্ম শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর রূপে অবতীর্ণ হইয়া দলিত, পতিত দিগকে শিক্ষায়, দিক্ষায় সমাজের উচ্চতর স্থানে ঠাঁই দিয়া গিয়াছেন। আর সকল ভক্ত দিগেরসুখ দুঃখের সাথী ছিলেন। এইরূপ ভক্ত ভগবানের এই মিলন উৎসব অনন্তকাল ব্যাপী প্রবাহমান থাকিবে। এই নামের প্লাবন ধারায় জগৎবাসী ধন্য হইতে ধন্য হইয়া গিয়াছে। তাই ভক্ত লোকেরা এই কলিযুগ ধন্য হইতে ধন্য বলিয়া কীর্ত্তন করিয়া থাকেন।
এই কলি কালে শ্রী গৌরাঙ্গ অবতার
বর্তমানে ক্ষেত্রে দারু ব্রহ্ম রূপ আর।
আমরা এতক্ষন পর্যন্ত শ্রী শ্রী ভগবান নিমাই চন্দ্রের আবির্ভাবে দিকে দিকে প্রেম ভক্তি যোগে অনার্পিত এই হরিনাম সর্ব জীবে প্রাপ্ত হইয়াছে বলিয়া কলিযুগকে ধন্য বলা হইয়াছে। এক্ষনে আমরা সেই নিমাই চন্দ্রের জন্ম উপাখ্যান শ্রবন করিতে বাঞ্চা করিতেছি। বিগত দ্বাপর যুগে শ্রী কৃষ্ণ চন্দ্র তাঁহার লীলা সাঙ্গ করিয়া নিত্য ধানে গমন করিলে, যুগ ধর্মমতে কলিযুগের আবির্ভাব ঘটিয়াছিল। তিনি স্বয়ং মুর্তিমান রূপে দর্শন দিয়াছিলেন। সেই সময়ের কাল হইতে এই ব্রহ্মান্ডে তিন পাদ ধর্ম্মলুপ্ত হইয়াছিল। শ্রী গৌরাঙ্গ দেবের আগমনের পূর্বে বা সেই সময়ে এই সমাজ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ রূপে ব্রাহ্মণ্য বাদের উপরে ভিত্তি করিয়া চলিতেছিল। তখন যদিও দুই একজন পরম বৈষ্ণব ছিলেন। তাহারা ব্রাহ্মণ্য বাদের জাতাকলে পিষ্ট হইয়া কোন ক্রমে তাহাদের স্বীয় ধর্ম্মকে ধারন করিয়া রাখিয়া ছিলেন। তখন কার দিনে এই হরিনাম করিলে মরা নাম বলিয়া ভয়ে দুরে সরিয়া যাইতেন। সেই সময়ের কালে অর্থাৎ,- গৌর সুন্দরের আর্বিভাবের পূর্বে লোকে দ্বাপর যুগের প্রবর্তিত বা প্রচলিত পূজা পার্ব্বনাদি হৈ হট্টোগোলের মাধ্য দিয়া ঈশ^রকে স্বরণ করিতেন। তখনকারদিনে ব্রাহ্মণ মন্ডলীরা যাহা বিধান দিতেন তাহাসকলকে মান্য করিতে হইত। কারণ ব্রাহ্মণ হইতেছে সকল বর্ণের শ্রেষ্ট। সেই সময় নদীয়ার বুকে ঘরে ঘরে টোল স্থাপন হইয়াছিল। সমগ্র দেশের উচ্চবর্নের হিন্দুরা ঐ টোলে পাঠ অভ্যাষ করিবার জন্য নদীয়ায় বসতি স্থাপন করিয়া অগনিত টোলের শিক্ষক মন্ডলী দিগের নিকট হইতে বিদ্যাভাষ করিতেন। হাটে মাঠে ঘাটে কেবল তর্ক আর শাস্ত্র দ্বারা ভগবানকে স্বীকার করিয়া লওয়া হইত। আবার কখনও বা সেই একই বক্তার মুখে হয়ত বা শোনা যাইত ঈশ^র বলিতে কিছুই নেই। একদিকে চলিতেছিল এই রূপ শাস্ত্রের ঝন ঝনানি। অন্যদিকে ছিল যবন রাজা কর্তৃক সনাতন ধর্মের নিপীড়ন। সমাজের এহেন দুর্দশা দর্শন করিয়া ঈশ^রের পরম ভক্ত বৈষ্ণবের শিরোমনি বরেন্দ্রদেশীয় কমালাক্ষ নামে পরম বৈষ্ণব যিনি অদ্বৈত আচার্য নামে পরিচিত। তিনি সঙ্গোপনে শ্রীবাসয়াদি চারি ভ্রাতার সহিত মিলিত হইয়া এই হরিনাম ধর্ম্ম পালন করিতেন। সমাজের এহেন দুর্গতির জন্য গঙ্গাগর্ভে ¯œান করিবার সময়, তুলসী পত্র ও গঙ্গা জল হস্তে লইয়া সেই পরমপুরুষ শ্রীহরির চরনে অর্পন করিতেন। আর তারই সাথে হুঙ্কার ছাড়িয়া বলিতেন, হে প্রভু! তুমি আবার এস। এই ধরার বুকে তুমি অবতীর্ণ হও। এই পাপী তাপী দিগকে তুমি মুক্তির বানী শ্রবণ করাও। এই রূপ ভাবে দিনের পর দিন প্রার্থনা করিতে থাকিলে, তাহাতে স্বয়ং গোলোক বিহারীর আসন খানা টলিয়া উঠিলে, ১৪০৭ শকে [ শকে বলিতে পূর্বে শক নামক রাজা কর্তৃক প্রচলিত বর্ষ গননা ] দোল পূর্ণিমা তিথিতে, চন্দ্র গ্রহনের কালে, সিংহ রাশিতে বুধবারের শুভক্ষনে সেই গোলোক বিহারী হরি নদীয়ার নবদ্বীপে নিম তরু তলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম ছিল জগন্নাথ মিশ্র। মাতার নাম ছিল সচীরানী। এই জগন্নাথ মিশ্রের পিতার নাম ছিল উপেন্দ্র মিশ্র।এই উপেন্দ্র মিশ্রের বাড়ী ছিল শ্রী হট্টে। ইনিছিলেন উচ্চ বর্নের কুলীন ব্রাহ্মন। উপেন্দ্র মিশ্রের সাত পুত্রের মধ্যে জগন্নাথ মিশ্র ছিলেন তৃতীয় পুত্র।
আমারা এক্ষনেএই কলিযুগের প্রথম অবতার শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের আবির্ভাবের পূর্বে তাঁহার মন্দির প্রতিষ্ঠিতার উপাখ্যান শ্রবন করিতে চাহিতেছি। অনেক অনেক দিন আগের কথা। গৌড় দেশে অবন্তি নগরে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি নীল মাধবদেবের আদেশে কলিঙ্গ রাজ্যে শ্রী ক্ষেত্র বা উৎকল নামক স্থানে একটি মন্দির তৈরি করিবার জন্য, বাউল মালা নামক স্থান হইতে অতি উন্নত মানের প্রস্তর খন্ড আনিয়া সমুদ্র গর্ভে শঙ্কনাভিতে মন্দির টি নির্মান করিয়া ছিলেন। আর সেই স্থানকে কৃষ্ণপুর নামে একটি নতুন গ্রামের নামকরন করিয়া জনবসতীতে পূর্ণ করিয়া ছিলেন। মহারাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ঐ মন্দিরটি নির্মান করিতে যাইয়া যাহাতে উহা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহার জন্য মৃত্তিকার তলদেশে ৬০ হস্ত এবং উপরের দিকে ১২০ হস্ত পরিমিত উ”ু করিয়া, তাহার শিখর দেশে একটি কলস এবং তাহার উপরে চক্র চিহ্ন স্থাপন করিয়া মন্দিরটির সৌন্দর্য বর্ধন করিয়াছিলেন।
মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন এই মন্দিরটিতে ভগবান ব্রহ্মাদেব কর্তৃক বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য ব্রহ্মলোকে গমন করিয়া তাঁহার নিকটে নিজের মনের কথা নিবেদন করিলে পর, তাহাকে সেই ব্রহ্মলোকে দীর্ঘদিন অবস্থান করিতে হইয়াছিল। এদিকে কালের বিবর্তনে মহারাজা কর্তৃক নির্মিত মন্দিরটি সুমুদ্রের বালুকা রাশি দ্বারা প্রায় ঢাকা পাড়িয়াগিয়াছিল। তাহা ছাড়া নরপতি শুণ্য রাজ্যে তখন একের পর এক প্রজা বিদ্রহ দেখা দিতে থাকিলে, ঐ রাজ্য পরিচালনা করিবার জন্য সর্বপ্রথমে সুদেব নামে এক মহাত্মা সিংহাসন অধিকার করিয়াছিলেন। এই রূপে দীর্ঘদিন ধরিয়া উক্ত রাজ্যে আরও কয়েক জন রাজা রাজ কার্য পরিচালনার পরে, সর্বশেষে গাল মাধবনামে জনৈক একজন রাজা ঐ সিংহাসনে উপবেশন করিয়া রাজ্য পরিচালনা করিতে লাগিলেন। তিনি সিংহাসনে উপবেসন করিবা মাত্রই বালুকা রাশি দ্বারা আবৃত্ত ঐ মন্দিরটির চারিদিকের বালুরাশি অপসরন করিয়া, উক্ত মন্দিরটি তিনিই নির্মান করিয়াছেন বলিয়া রাজ্যময় ঘোষনা করিয়া দিলেন। ঠিক সেই মুহুর্তে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ব্রহ্মলোক হইতে প্রত্যাবর্তণ করিয়া প্রজাবর্গের মুখে সমুদয় কথা শ্রবন করিয়া রাজা গাল মাধবের নিকটে উপস্থিত হইলেন। তিনি নতুন রাজা গাল মাধবকে বলিলেন, আমি এই মন্দিরটি নির্মান করিয়া ছিলাম। কিন্তু রাজা গাল মাধব কোন মতেই ইহা স্বীকার করিয়া লইতে চাহিলেন না। তাহা ছাড়া তিনি পুরাতন রাজার সহিত গন্ডগোলের সৃষ্টি করিয়া, তাহাকে রাজ্য হইতে বিতাড়িত করিতে চাহিলেন। সহসা মন্দিরের সন্নিকটে কল্প বৃক্ষ সম যে বট বৃক্ষ ছিল, ঐ বট বৃক্ষের উপরে বহুযুগ ধরিয়া অবস্থানরত রাম নাম জপনাকারী ভক্ত ভূশু-ি নামক একটি কাক পক্ষী এই মন্দির নির্মানের প্রকৃত ঘটনাবলী প্রকাশ করিলে, নতুন রাজা গাল মাধব সেই মহুর্তে মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নের নিকটে ক্ষমা ভিক্ষা চাহিয়া, তাহার হস্তে রাজ্যের সমুদয় দায় দায়িত্ব অর্পন করিয়া নিজেকে ধন্য মনে করিয়া স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন।
এই যে মহারাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ঐ মন্দিরটিতে ভগবান বহ্মাদেবের দ্বারা বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিয়া ছিলেন। রাজার সেই ইচ্ছাপূর্ণ হয় নাই। ভগবান ব্রহ্মাদেব রাজার হস্তে একটি পতাকা অর্পণ করিয়া বলিয়া ছিলেন, আপনি এই পতাকাটি ঐ মন্দিরের শিখর দেশে উত্তোলন করিয়া দিবেন। যাহারা বহুদুর হইতে ঐ পতাকাটি দর্শন করিয়া প্রেম ভক্তির সহিত দন্ডবৎ করিবে, তাহারা অনাসায়ে মুক্তিলাভ করিতে পারিবে। তিনি আরও বলিয়াছিলেন, এই ক্ষেত্র ভূমিটি স্বয়ং ভগবানের স্বরূপ শক্তি দ্বারা প্রকাশিত। তাই ঐ মন্দিরটিতে আমা কর্তৃক দেবতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব পর হইতেছেনা। মহারাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ভগবান ব্রহ্মাদেবের নিকট হইতে এই রূপ অপ্রত্যাশিত ভাবে রাজ্যে প্রর্ত্যাবর্তনের পরে, তিনি সিংহাসনে উপবেশন করিয়া মন্দিরের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠান হেতু কোন শান্তি লাভ করিতেছিলেন না। তাই তিনি রাজ আভরণ ও সিংহাসনাদি সমস্ত সব কিছু পরিত্যাগ করিয়া কুশের নির্মিত আসনে বসিয়া অনশন ব্রত পালনে ব্রতী হইলেন। এই রূপ ভাবে তিনি অনশন ব্রতের মধ্যে দিয়া প্রাণ ত্যাগ করিতে চাহিলে, সহসা সপ্ন যোগে তিনি শুনিতে পাইলেন, বৎস ইন্দ্রদ্যুম্ন! তুমি নিরাশ হইওনা । ঐ সমুদ্রের মধ্যে বঙ্কিম মহান নামক স্থানে আমি দারুব্রম্ম [কাষ্ঠরূপে] রূপে ভাসিতে ভাসিতে উপস্থিত হইব। তুমি তোমার সৈন্য সামন্ত লইয়া শত চেষ্টা করিলে ও আমাকে লইয়া যাইতে পারিবেনা। তুমি ইতি পূর্বে তোমার কুল দেবতা নীল মাধব দেবলার যে পূজারী ব্রাহ্মন রহিয়াছে, তাহার স্মরণাপন্ন হইয়া আমাকে লইয়া যাইতে সুবর্ণময় একটি রথের আয়োজন কর।
প্রবল প্রতাপশালী মহারাজা স্বপ্নাদেশের কথানুযায়ী পূর্বের পূজারী ব্রাহ্মণ ও সুবর্ণময় রথ নির্মান করিয়া, মহা আড়ম্বের সহিত উক্ত স্থান হইতে প্রেম ভক্তি সহকারে ঐ দারু ব্রহ্মকে উত্তোলন করিয়া আনিয়া স্বীয় নির্মিত মন্দিরের একটি গোপন প্রকোষ্টে রাখিয়া দিয়া, দেশ বিদেশ হইতে কারুকার্যে নিপুনতা বহুদেব শিল্পী নির্মিতাদিগকে আনিয়া ঐ দারু ব্রহ্মকে , শ্রী মুর্তিতে রূপদান করিবার জন্য নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তাহারা কেহই ঐ ব্রহ্ম রূপ কাষ্ঠটির অঙ্গে অস্ত্র সস্ত্র দ্বারা স্পর্শ করিতে সক্ষম হইলেন না। অত:পর ভগবান জগন্নাথ দেব নিজেই দেব শিল্পী মহারানা নামে নামকরন করিয়া মন্দির প্রাঙ্গনে উপস্থিত হইয়া, একুশ দিনের মধ্যে ঐ দারু ব্রহ্মকে শ্রী মুর্তি রূপে রূপান্তরিত করিতে পারিবেন বলিয়া মহারাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে অভয় প্রদান করিলেন। তিনি মহারাজাকে আরও বলিলেন যে, এই তিন সপ্তাহ কালব্যাপী আমি একাকী ঐ মন্দিরের ভিতরে অবস্থান করিয়া স্বীয় কর্মে নিয়োজিত থাকিব। ঐ সময়ের মধ্যে কেহই ঐ মন্দিরের দ্বার খুলিবার চেষ্টা করিবেন না।
এই রূপ একটি কঠিন শর্ত প্রকাশ করিয়া শিল্পী মহাশয় ঐ দারুব্রহ্মকে মন্দিরের মধ্যে লইয়া দিবারাত্র ব্যাপী অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়া ঐ দারু ব্রহ্মকে শ্রী মুর্তিতে রূপদান করিতে লাগিলেন। এই রূপে দুই সপ্তাহ কাল অতিবাহিত হইলে পরে, মন্দিরের অভ্যন্তর হইতে পূর্বের ন্যায় কোন শব্দ বাহিরে আসিতেছে না দেখিয়া, রাজ পরিবারের সকলেই ভীষণ চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। অতঃপর রাজা মহাশয়, ও মহা রানী গুন্ডিচা দেবী,রাজভ্রাতা চন্দ্র কান্তর স্ত্রীর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতানপুংশক অজামিলের প্ররোচনায় রাজ মন্ত্রী বর্গদিগের নিষেধ অমান্য করিয়া মন্দিরের দ্বার খুলিয়া দেখিতে পাইলেন, সত্যই দারুব্রহ্ম দ্বারা তিনটি মুর্তি নির্মিত হইয়াছে। কিন্তু উহাদের হস্ত পদাদিতে অঙ্গুলি সংযুক্ত ক্রিয়া অসমাপ্ত রহিয়াছে। আর বৃদ্ধ দেবশিল্পী ও সেই স্থান হইতে নিরুদ্দেশ হইয়া গিয়াছেন। এই রূপ হৃদয় বিদারক দৃশ্য দর্শন করিয়া মহারাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন নিজেকে মহা পাতকী মনে করিয়া আবার ও অনশন ব্রত পালন করিয়া প্রাণ ত্যাগ করিবেন বলিয়া নির্জন কক্ষে প্রবেশ করিয়া দ্বার বন্ধ করিয়া দিলেন। এ দিকে ভক্তাধীন ভগবান ভক্তের মনের কথা বুঝিতে পারিয়া দৈববানী সম বলিলেন। হে বৎস! তুমি শান্ত হও।আমি অদ্যাবধি এই রূপে এই ক্ষেত্র ভূমিতে অবস্থান করিব। তবে যদি তোমার অন্তরে একান্ত বাসনা থাকে, তাহা হইলে তুমি আমাদের হস্ত পদাদিতে সুবর্নের অঙ্গুলি নির্মান করিয়া সংযুক্ত করিও। এই সময়ের কালে মহারাজা, ভগবান বলরাম, ভগিনী সুভদ্রাও শ্রী কৃষ্ণ চন্দ্রের মুর্তি তিনটির কাছে এই প্রার্থনা করিলেন যে, যে দেব শিল্পী এই মুর্তি ত্রয় সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহার বংশধরেরা যুগে যুগে জীবিত থাকিয়া রথ উৎসবের সময় যেন তিনটি রথ নির্মান করিয়া দেন।
ইহার পরে ভগবান জন্ননাথদেব মহারাজকে বলিলেন, পূর্বে যে নীল মাধব দেবের পূজারী নীচু জাতি সবরবাজ বিশ^াবসুর কন্যা ললিতাও তোমারবিশ^স্ত মন্ত্রী বিদ্যাপাতির প্রথমা স্ত্রী মিনাক্ষীর বংশ ধরেরা যেন আমার দয়িতা সেবা কার্যে নিযুক্ত থাকে। ভক্ত বিদ্যাপতির দ্বিতীয় স্ত্রীরাজগুরু স্বামী ব্রহ্মানন্দের কন্যা বা বংশধরেরা এই শ্রী ধামের প্রসাদ তৈরী কার্যে নিয়োজিত থাকে। সর্বশেষে ঐ দেব বিগ্রহটি মহারাজাকে একটি বরপ্রদান করিতে চাহিলে,তখন মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন দেবতার নিকটে এই বর প্রার্থনা করিলেন, যেন তাহার বংশে কোন বংশধর না থাকে। কারন তাহারা এই ক্ষেত্র ভুমিটি তাহাদের নিজস্ব সম্পদ বলিয়া দাবি করিবে। অতঃপর স্বপ্ন প্রদত্ত দেবলা তথাস্থ বলিয়া অন্তর্ধান হইলেন। এই শ্রী ক্ষেত্রে ভগবান জগন্নাথ দেবের আর্বিভাব সম্বন্ধে শুনিয়াছি বৃহৎ নারদীয় পুরানে বর্নিত রহিয়াছে। নারদীয় পুরাণে পুরুষোত্তম নারায়ন লক্ষ্মীদেবীকে বলিতেছেন, পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে আমারই বিগ্রহ বিরাজমান রহিয়াছে। [ হরে কৃষ্ণ সমাচার ইং ২০১২ বা: ১৪১৯ সাল জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসিক পত্রিকা] এই দারু ব্রহ্ম বিগ্রহ সম্বন্ধে কেহ কেহ এই রূপ বলিয়া থাকেন যে, দ্বাপর লীলা অবসান হেতু শ্রী কৃষ্ণ ভগবান, যে বৃক্ষমূলে আসন গ্রহন করিয়া বসিয়া ছিলেন। আর দুর হইতে জরা নামক ব্যাধ তাহার রক্তিম বরণ যুগল চরন দুখানিকে পক্ষী মনে করিয়া তীর নিক্ষেপ করিলে, সেই শরা ঘাতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র মানবলীলা স্বরণ করিয়া নিত্য ধামে গমন করিয়াছিলেন। সেই নিম্ব বৃক্ষটি দ্বারা শ্রী মুর্তি তৈরি করিয়া শ্রী ক্ষেত্রে স্থাপন করিতে পরমব্রহ্ম শ্রী হরি স্বপ্নাদেশে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন মহাশয়কে আদেশ দিয়া ছিলেন।
শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের নব কলেবরের সৃষ্টি রহস্যঃ- আমরা সকলেই জানি যে, শ্রী ক্ষেত্রের জগন্নাথ মুর্তিটি রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের কাল হইতে অদ্যাবধি পুজিত হইয়া আসিতেছে। কিন্তু পূর্বে আলোচিত হরে কৃষ্ণ সমাচারে লেখক বলিয়াছেন। এই জগন্নাথ দেবের শ্রী মুর্তি বর্তমান সময়ের কাল বা বহুকাল পূর্ব হইতে ২০ বৎসর অন্তর নুতুন নুতুন রূপে নির্মিত হইয়া থাকে। বহু বিধ শাস্ত্রয়াদির নিময় অনুসারে এই রূপ বিধান করা হইয়াছে। অদ্যাবধি সেই সমস্ত শাস্ত্র গ্রন্থাদি ঐ মন্দিরে সংরক্ষিত রহিয়াছে। ইহার মধ্যে তালপত্র এবং তা¤্রপত্রে লিখিত গ্রন্থাদি অন্যতম। এই সমুদয় গ্রন্থাদির বয়সসীমা সকলের অজ্ঞাত রহিয়াছে। মুনি ঋষিরা ইহা ধ্যান যোগের দ্বারা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।
এই নবকলেবর অর্থাৎ,- নুতুন রূপে আবার এই শ্রী মুর্তি গঠনের কার্যাবলী শুরু হইয়া থাকে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মধ্যেদিয়া। যে বৃক্ষ দ্বারা এই নুতুন কলেবর তৈরী করা হইয়া থাকে। এই বৃক্ষটি সাধারণ বৃক্ষ অপেক্ষা ভিন্ন ধরনের হইয়া থাকে। এই বৃক্ষটি অবশ্যই নিম্ব বৃক্ষ হইতে হইবে। ইহার স্বাদ ও ঈষৎ মিষ্ট হইতে হইবে। এই বৃক্ষটি বজ্রপাতে কিম্বা ঝটিকা প্রবাহে কিম্বা কোন পক্ষী কুলের আবাসস্থল হইয়া, শাখা প্রশাখা গুলি ক্ষতি সাধিত হইলে গ্রহন যোগ্য হইবে না। আবার এই বৃক্ষটি কোন শিব মন্দির বা কোন শশ্মান ভূমি কিম্বা ত্রি রাস্তার মিলন স্থলে বা সরোবরের তীরে বা নদী তীরে হইতে হইবে। ইহা ছাড়া এই বৃক্ষটির তিন পাঁচ ও সাতটি শাখা যুক্ত হইতে হইবে। শ্রী কৃষ্ণের বৃক্ষটি ঈষৎ কৃষ্ণ বর্ণ। শ্রী বলদেবের শে^তবর্ণ এবং দেবী শুভদ্রার দারুটি ঈষৎ রক্তাভ হইতে হইবে। এই সকল দারু ব্রহ্মের গাত্র দেশে শঙ্ক চক্র গদা পদ্ম চিহ্ন থাকিতে হইবে।
এই রূপ ধরনের বৃক্ষ অনুসন্ধানের সময় একটি সঙ্গবদ্ধ দল গঠিত হইয়া থাকে। তাহাতে পাতি মহাপাত্র পরিবারের একজন ভক্ত। কুড়িজন দয়িতাপতি সম্প্রদায়ের ভক্ত। লেঙ্কা সম্প্রদায়ের একজন ভক্ত। নয়জন ভক্ত মহারানা পরিবারের। ষোলজন ব্রাহ্মন। তিনজন দেউল করন। ত্রিশ জন পুলিশ। দুইজন ইন্সপেক্টর লইয়া এই দলটি গঠন করা হইয়া থাকে। এই রূপ ভাবে দলটি গঠন হইলে, বৃক্ষ অনুসন্ধানের জন্য সর্ব প্রথমে শ্রী জগন্নাথ দেবের আশীর্বাদ লইতে হয়। এই সময় ২০ ফুট দীর্ঘ একটি সুগন্ধি মালা শ্রী জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা দেবীকে প্রদান করিলে, ইহার পর পাতি মহাপাত্রের সর্ব প্রাচীন ভক্তকে প্রধান পূজারী দ্বারা মাল্য প্রদান করিলে, ঐ ভক্ত উহা সাদরে গ্রহন পূর্বক মস্তকে ধারন করেন। তাহার পরে কোন স্থানে কোথায় কি প্রকারে এই দারু ব্রহ্মের সন্ধান মিলিবে তাহার জন্য সর্বাগ্রে অগ্নি প্রজ্জলিত কলিয়া যজ্ঞকার্য সম্পন্ন করিতে হয়। এই সময়ের কালে উপরিয়োক্ত সকল সম্প্রদায়ের বংশ ধরেরা তাহাদের মস্তকে জগন্নাথদেবের প্রসাদি বস্ত্র ধারন করিয়া, সর্বক্ষন অন্তর মধ্যে এই রূপ কল্পনা করিতে থাকেন। যেন ভগবান জগন্নাথ দেব স্বয়ং তাহাদের সহিত বিরাজমান রহিয়াছেন। ইহার পরে মন্দিরের মেকাপ পরিবারের প্রবীন কোন ভক্ত, শ্রী জগন্নাথ দেবের পাদুকা দ্বারা ঐ দলের প্রত্যেকের মস্তক স্পর্শ করিয়া থাকেন। ইহার পরে পট্ট যোষক পরিবারের আর একজন পূজারী উক্ত দলের লেঙ্কা ও মহারানা পরিবারের ভক্তদিগকে শ্রী জগন্নাথ দেবের প্রসাদিবস্ত্র অর্পন করিয়া থাকেন। ইহারাই রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের সময়কাল হইতে শ্রীমুর্তি তৈরির বংশ ধর বলিয়া পরিচিত।
এই রূপ দল গঠনের কার্য সমাপ্ত হইলে, তাহারা সকলেই মিলিত হইয়া নাট মন্দির পরিক্রম করিয়া পুরী রাজের আজ্ঞা লাভের জন্য রাজ ভবনে গমন করেন। তাহার পরে সেখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া কিছুদুরে জগন্নাথ বল্লভের উদ্যানে যাইয়া দুই দিন অবস্থান করেন। ইহার পরে কাকটপুর নামক স্থানে মঙ্গলচ-ীর বা বিমলা দেবীর পীঠ স্থলে গমন করেন। ঐ স্থানটি শ্রী ক্ষেত্র হইতে পঞ্চাশ মাইল দুরে অবস্থিত। এই সময়ের কালে প্রধানতম দয়িতা পতি ঐ মঙ্গল চন্ডীর মন্দির অভ্যন্তরে থাকিয়া মায়ের নিকট হইতে ঐ দারু ব্রহ্মগুলি কোথায় পাওয়া যাইবে তাহারই ধ্যানে মত্ত থাকেন। এই দারুব্রহ্ম সংগ্রহের কাজটি পনেরদিন অথবা এক মাসের মধ্যে সমাপ্ত করিতে হয়। অতঃপর মাতৃ আদেশে বৃক্ষগুলির সন্ধান মিলিলে পরে সকলেই নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইয়া, সমুদয় দেবতা মন্ডলী দিগের নিকট হইতে আশীর্বাদ লাভ করিবার জন্য, অতি ধুম ধামের সহিত সেই স্থানে একটি যজ্ঞ ক্রিয়ায় ব্রতী হয়েন। এই যজ্ঞ ক্রিয়া শেষ হইলে দারু ব্রহ্ম ছেদনের পূর্বে, পাতি মহাপাত্রের ভক্ত প্রবর স্বর্ণ নির্মিত কুঠার, দয়িতা পতিভক্ত প্রবর রোপ্য নির্মিত কুঠার, ও মহারানা পরিবারের ভক্ত প্রবর লৌহ নির্মিত কুঠার দ্বারা ঐ দারু ব্রহ্মকে স্পর্শ করিয়া থাকেন। ইহার পরে ঐ দারু ব্রহ্ম রূপ বৃক্ষ গুলির ছেদন ক্রিয়া সমাপ্ত হইবার পরে ঐ বৃক্ষ গুলি কিম্বা বৃক্ষটি, একটি কাষ্ঠ নির্মিত বাক্সের মধ্যে পুরিয়া শ্রী ক্ষেত্রে আনায়ন করা হয়। কাষ্ঠ ছেদনের কাল হইতে পথ যাত্রার সময় কাল পর্যন্ত অন্যান্য ভক্তেরা মিলিত হইয়া পাতাল নৃসিংহ দেবের গুন কীর্ত্তন করিতে থাকেন। উপরিয়োক্ত দারু ব্রহ্ম গুলি শ্রী ধামে উপস্থিত হইলে প্রধান তম পূজারী মহাশয় ঐ বাক্সটি পুরীর হস্তি দ্বারে অবস্থিত কোইলি বৈকুণ্ঠ নামক স্থানে সংরক্ষিত করিয়া রাখেন। (কোইলি - সমাধি বৈকুণ্ঠ- চিদলোক স্বরূপ) এই কোইলি বৈকুন্ঠের মধ্যে পুরাতন বিগ্রহ গুলি সমাধি রূপে রাখা হইয়া থাকে। এই সময় নতুন বিগ্রহের কার্য শুরু হইয়া যায়। মহারাজ ইন্দ্রদ্যুন্মর সময়ে যে শিল্পী এই বিগ্রহ গুলি তৈয়ার করিয়া ছিলেন, তাহারই বংশ ধরেরা ঐ কোইলি বৈকুন্ঠের মধ্যে অবস্থান করিয়া নতুন বিগ্রহ গুলি নির্মান করিতে থাকেন। ঐ সময়ের মধ্যে অন্য কোন ব্যক্তি ঐ স্থানে যাইতে পারিবেন না। এই রূপ নীতি প্রচলন রহিয়াছে। বিগ্রহ গুলি নির্মাণ কার্য সমাপ্তির পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত মন্দিরের বাহিরে দেবদাসীগণ প্রেম ভক্তির সহিত দিবানিশি নাম সং কীর্ত্তনে মত্ত থাকেন।
এই রূপভাবে নতুন বিগ্রহ তৈরির কার্য সমাপ্ত হইলে, দয়িতা পতিরা ঐ নতুন বিগ্রহ গুলি গর্ভ মন্দিরের মধ্যে লইয়া যাইয়া পুরাতন মুর্তি গুলির সম্মুখে রাখিয়াদেন। ঐ সময়ও কেহ ঐ স্থানে যাইতে পারেন না। রথ যাত্রার তিন দিন পূর্বে কেবল মাত্র প্রধান দয়িতা পতিসহ তিন জন সেই স্থানে অবস্থান করিতে থাকেন। এই সময় দেব বিগ্রহের কোন পূজার্চনা ও সরকারের নির্দেশে পুর শহরটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন থাকে। বিশেষ ভাবে দারু সংগ্রের কাল হইতে দযিতা পতিরা ক্ষৌর কার্য হইতে ও বিরত এবং সাদা থান পরিয়া কাল যাপন করিতে থাকেন। তাহাদের অন্তরে এই রূপ ভাবনা জাগে যে, এই জগন্নাথ দেব তাহাদের পরিবারেরই একজন সদস্য। এই বিগ্রহ গুলি মন্দিরে স্থাপন করিবার সময় উক্ত দয়িতা পতিদিগের চক্ষু যুগল ও হস্তের কনুই পর্যন্ত সাদা কাপড় দ্বারা আবৃত থাকে। বিগ্রহ গুলি মন্দিরে স্থাপিত হইলে পূজারীরা প্রেম ভক্তির সহিত পূজার্চনা করিতে থাকেন। [ ইতি পূর্বে ইং ১৯৩১, ১৯৫০, ১৯৬৯, ১৯৯৬ ও ২০১৫ সালের ১৭ ই জুন। শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের নবকলেবর অনুষ্ঠানের পর্ব সমাপ্ত হইয়া গিয়াছে।]
[রাজ গুরুর নাম ব্রহ্মানন্দ স্বামী। তাহারই কন্যা মিনাক্ষী দেবী। নিন্ম বর্ণের জাতি হইতেছেন সবরবাজ। তিনি ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে নিজ জন্ম ভিটা পরিত্যাগ করিয়া কলিঙ্গ রাজ্যে আশ্রয় গ্রহন করেন। তাহার এক মাত্র কন্যা সন্তানের নাম ললিতা দেবী। অবন্তি নগরের রাজা ছিলেন ‘‘ইন্দ্রদ্যুম্ন’’। তাহার পাট রানীর নাম ছিল গুন্ডিচা দেবী। ইন্দ্রদ্যুম্নের ভ্রাতার নাম চন্দ্রকেতু। চন্দ্রকেতুর স্ত্রী তারা দেবী ছিলেন গান্ধার রাজকুমার নপুংসক অজামিলের ভগ্নী। এই অজামিল এবং তারাদেবী ও চন্দ্রকেতু রাজ পুরীতে কুমন্ত্রনায় নিযুক্ত ছিলেন। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের রাজ সভার বিশ্বস্ত মন্ত্রীর নাম বিদ্যাপতি। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্নাদেশে নীলমাধবের সন্ধান করিতে মন্ত্রীবিদ্যাপতিকে পূর্ব দিকে পাঠাইলে মন্ত্রীবরের সঙ্গে কুটচক্রী অজামিল যাত্রা করেন। প্রথম হইতেই এই অজামিল ও চন্দ্রকেতু রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে বধ করিয়া রাজ্য ভার গ্রহন করিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু কেবল মাত্র বিশ্বস্ত মন্ত্রী বিদ্যাপতির কারনে তাহাদের সকল আশা বিফল হওয়ায়, সর্বশেষে তাহারা বিদ্যাপতিকে প্রাণে বধ করিবার জন্য মন্ত্রী বিদ্যা পতির সহিত নীল মাধবের সন্ধানে বাহির হয়। এই অজামিল নিজেই সৈন্য সামন্ত দিগকে বশীভূত করিয়া বিদ্যাপতির সহিত সাগর তীরের অপর পারে যাইয়া নীল মাধবের সন্ধান করিবে বলিয়া, ঐ নৌকায় উঠিয়া মন্ত্রী বিদ্যাপতিকে মদিরা পান করাইয়া, বিবস অবস্থায় নদী বক্ষে নিক্ষেপ করিলে স্বয়ং প্রভূ নীল মাধব বা শ্রী কৃষ্ণ চন্দ্র তাহাকে উদ্ধার করিয়া সাগর তীরে রাখিয়া দিলে এই সবর রাজ বিশ্বাবসুর সহিত তাহার পরিচয় ঘটে। তাহার পরে সবর কন্যা ললিতার সহিত তাহার বিবাহ হয় এবং সবর রাজ বিশ্বাবসু কর্ত্তৃক নীল মাধবের সন্ধান পাইয়া পুনরায় অবন্তী নগরে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের নিকটে উপস্থিত হইলে, সেই সময় রাজ গুরু অর্থাৎ,- সতী দেহের ৫১ খন্ডের এক অংশ এই অবন্তী নগরে পতিত হইলে সেই স্থানে বিমলা দেবীর পূজায় ব্রতী ছিলেন এই রাজগুরু ব্রহ্মানন্দ স্বামী।]
অষ্টবিংশ অবতার তত্ত্ব।
আমরা এই অষ্টবিংশ অবতার তত্ত্বগুলি জানিবার পূর্বে এই মঙ্গলাচরনের পূর্ণ সার্থকতার বিষয় সম্বন্ধে আলোকপাত করিতে চাহিতেছি। মঙ্গলাচরনের অর্থ হইতেছে- জীবে বা মনুষ্য সকল যে নাম ভক্তি প্রেমের সহিত পাঠ করিলে, তাহাতে জীবের দৈনন্দিন জীবন যাত্রার পথ, বাধা বিপত্তি হীন হইয়া সমুদয় কর্মাদি শুভফল প্রদ হইয়া থাকে। আমরা জাগতিক জগতে জ্যোতিষী কিম্বা বিজ্ঞানীদের মতে নয়টিগ্রহের কথা আলোচনা করিয়া থাকি। জ্যোতিষ বিজ্ঞানীদের মতানুসারে মনুষ্য সকল তাদের দৈনন্দিন জীবন যাত্রার পথ অতিক্রম করিতে যাইয়া, এই নয়টি গ্রহের কোন না কোন একটি গ্রহের দশায় পড়িয়া অশুভ সময়ের মধ্যে থাকিয়া দিন যাপন করিতে থাকে। আমরা মহাভারতাদি গ্রন্থের মধ্যে দেখিতে পাইতেছি, মহারাজাধি রাজ শ্রীবৎস নামে এক রাজা গ্রহরাজ শনি দেবতার কবলে পড়িয়া রাজ্য ধন সব কিছু হারা হইয়া ছিলেন। তাই এই রূপ মহা গ্রহ বিপাক হইতে মুক্তিলাভ করিবার জন্য, কতনা ধনীমানী বিত্তবান মানুষেরা, জ্যোতিষ বিজ্ঞানীদের দ্বারা হস্তরেখা বিচার করিয়া বিভিন্ন প্রকারের রতœ পাথর ধারন করিয়া রখিয়াছেন। কিন্তু এই রূপ রত্ন পাথর গুলি আবার সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার ও বাহিরে রহিয়াছে। আবার এই সমস্ত পাথর গুলি সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করিতে না পরিলে, তাহাতে সুফলের স্থানে কুফল ফলিয়া থাকে। তাই শ্রীমদ তারক গোস্বামী সকল প্রকার মানুষের জন্য এই মঙ্গলাচরন গীতি রচনা করিয়াগিয়াছেন। যাহা পাঠ করিলে জীবের মঙ্গল ছাড়া অমঙ্গলের আশঙ্খা থাকেনা। আপনারা লক্ষ করিয়া দেখিবেন, বর্তমান সময়ের কালে মাহাত্মা যজ্ঞেশ্বর রায়ের রচিত নবযুগ ডইরেক্টরী পঞ্জিকায় (ইং- ২০১৮ বা ১৪২৫ সালে) জ্যোতিষ বচানার্থ অধ্যায়ের ১০৭ পৃ: বর্নিত যথা গ্রহগনের অধিষ্ঠাতা দেবতা ও অবতার প্রসঙ্গে।
পরবর্তী পর্বে